Lyrics has been copied to clipboard!
১৮ আগস্ট/১৬; রোজ- বৃহস্পতিবার। মামাকে দেখার জন্য কুড়িগ্রাম সরকারি কারাগারে গিয়েছিলাম। দেরিতে যাবার কারনে প্রথম সিডিউল মিস্ করি। দীর্ঘ দেড়(১.৫) ঘন্টা অপেক্ষার পর যোহর নামাজের শেষে মামাকে দেখার সৌভাগ্য হয়। কথা বলার এক পর্যায়ে মামার কাছে জানতে চাইলাম ভিতরের পরিবেশ ও সমস্যার কথা। জবাবে জানতে পেলাম অস্বাভাবিক এক পরিবেশে খাবার এবং থাকবার সমস্যা প্রকট। পরে খাবার কিনে দিতে চাইলে, মামা বলেন বরং টাকা পাঠায় দাও। কথামত টাকা পাঠানোর পর আবারো ইচ্ছা হল মামাকে দেখব। তাই আবারো নাম এন্ট্রি করলাম। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলাম।
কত শত লোকের সমাগম; বন্দি শিবীরের মানুষগুলোকে দেখার জন্য। কেউবা আবেগে উৎফুল্যুতায় চোখের জল গঢ়ায় দিয়ে নিরীহের মত কেবলই মাতম করছে। কেউবা অন্তঃ ক্রন্দনে হৃদয়ের জমিন ভিজায়ে নিচ্ছে। কেউবা জেলখানার খোপ খোপ জানালা দিয়ে অধীর আগ্রহে খুঁজছেন তার আপনজনকে। পরক্ষনে পশ্চিমের ৩য় জানালায় দেখতে পেলাম কারাবন্দি বাবা কথা বলছেন তার(৪-৫) বৎসরের মেয়ের সঙ্গে। মেয়ে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল- বাবা আমি ট্রেনে ওঠবো। বাবা বললেন- মাবো বাড়ি যাবার সময় ট্রেনে যাবে কেমন। মেয়ে আবার বলল- তুমি কখন যাবে বাবা? বাবা কান্না চাঁপা দিয়ে কৃত্রিম হাস্যমুখে বললেন- আমি রাত্রে যাব মা। অবুঝ শিশু তাই বিশ্বাস করে বাবার নিকট শেষ আব্দার করলো বাবা যাবার সময় আমার জন্য গুড় নিয়ে যাবা। বাবা আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেননা। দুহাতে চোখের জল মুছে কান্নার স্বরে বললেন নিয়ে যাব মা। আমিও পারিনি শিমর হতে, ক্ষতবিক্ষত হয়ে ওঠলো হৃদয়টা। আপনা হতে কয়েক ফোঁটা শীতল চোখের জল নিরবে ঝরে গেল।
তিন জানালার খোপ দিয়ে আবার খুঁজতে লাগলাম মামাকে। কখন আসবে! যেন অধৈর্য্য হয়ে ওঠলাম। কিছুক্ষণ পরে পূর্বের অর্থাৎ ১ম জানালায় দেখলাম গ্রিলের লৌহদন্ডে দুহাতে ভর করে ঝুলন্ত অবস্থায় কথা বলছেন এক মহিলা। অধীর আগ্রহে ছুঁটে গেলাম সেদিকে। যেতেই বুঝতে পারলাম, কেন মহিলাটি পাখির মত ঝুলে। জন্মগত প্রতিবন্ধকতা। পায়ে ভর করে চলতে পারেনা। তাই ছোট শিশুর মত হাটুতে ভর করে চলেন। বিদায় বেলা লালঘরের গেট থেকে হাত নেড়ে নেড়ে আর চোখের জলে স্বামিকে বিদায় জানাচ্ছেন এবং বলছেন আমি যাচ্ছি তবে আবারো আসবো। তুমি ভালো থাকো। স্ত্রীর চোখের জল সহ্য করতে না পেরে স্বামিটিও কেঁদে ফেললেন। মানুষের প্রতি মানুষের এই প্রেম মহান, যে প্রেম কাঁদাতে জানে। কারণ আমিও চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। হামাগুড়ি দিয়ে চলন্ত মহিলাটিকে জানার আকাঙ্খায় জিজ্ঞাস করলাম- আপনার বাসা কোথায়? কি করে এসেছেন এখানে? মহিলাটি প্রতিত্তরে বললেন বাসা রৌমারী(ফুলয়ার চর); আর ৩০০/= রিজার্ভে নৌকা করে এসেছি। নাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন- আমার নাম আমিনা, বাবার নাম আব্দুল আজিজ, স্বামির নাম মাইদুল ইসলাম। পরে জানতে পেলাম তার স্বামি গোপনে ২য় বিয়া করে এবং ২য় পক্ষেরই মামলায় আজ কারাগারে। তাদের(আমিনা ও মাইদুল) বিয়ার বয়ষ ১০ বৎসর। ঘরে একটি চাঁদের মত ছেলে(ছবিতে যে ছেলেটি)। অনেক কষ্ট করে সংসার চলে। সরকার কোন খোঁজ খবর রাখেনা। পঙ্গু ভাতাও পায়না সে। আমি কেবলই নিরবে শুনে গেলাম আর শেষে বললাম যদি কিছু করতে পারি তবে জানাব।
অত:পর ডিউটিরত কনস্টবল মারফত অবগত হলাম ১ম বার দেখার পর ২য় বার আসামিকে দেখার সুযোগ নেই। অভিজ্ঞতার অভাবে পুরোদিন চলে গেলে মামাকে দেখার অতৃপ্তি থাকলো; তবুও, বাবা-মেয়ের সেই অতুলনীয় স্নেহমাখা ভালবাসা, স্বামি-স্ত্রীর সেই অকৃত্রিম প্রেম দুদন্ড প্রশান্তি দিয়েছে আমাকে। শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেল এমন এ ভালোবাসার তরে।
